‘বনলতা এক্সপ্রেস’: ট্রেনযাত্রায় জীবনের গভীর দর্শন ও মানবিক গল্প

Date: 2026-05-28
news-banner

হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস কিছুক্ষণ অবলম্বনে নির্মিত এবং পরিচালক তানিম নূর পরিচালিত চলচ্চিত্র বনলতা এক্সপ্রেস একটি ব্যতিক্রমী সাহিত্যনির্ভর সিনেমা। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী একটি ট্রেনযাত্রাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চলচ্চিত্রে অপরিচিত যাত্রীদের জীবনের ভেতরের গল্প, ব্যক্তিগত সংকট, হাস্যরস, শোক, দার্শনিক ভাবনা এবং মানবিক সম্পর্কের জটিল রসায়ন একসাথে ফুটে উঠেছে।


এই সিনেমাটি শুধু একটি ট্রেনযাত্রার গল্প নয়; বরং এটি প্রতিটি চরিত্রের অন্তর্গত আত্মিক যাত্রার প্রতিচ্ছবি। ট্রেনের সীমিত কামরার ভেতরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পারস্পরিক সংলাপ ও অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে তাদের জীবনদর্শনকে বদলে দেয়।



EkpzhLc.png



চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অসাধারণ নির্মাণশৈলী। ট্রেনের সংকীর্ণ জায়গার মধ্যেও ক্যামেরার মিড-ক্লোজ শট, ওভার-দ্য-শোল্ডার অ্যাঙ্গেল এবং সূক্ষ্ম ভিজ্যুয়াল ফ্রেমিং চরিত্রগুলোর আবেগকে জীবন্ত করে তোলে। জানালার বাইরে কুয়াশা, ভেতরের মৃদু আলো এবং রঙের ব্যবহার এক রহস্যময় ও গভীর আবহ তৈরি করে। বিশেষ করে ম্যাচ-কাট এডিটিং ও সাউন্ড ট্রানজিশন (যেমন দরজার শব্দ, চায়ের কাপের আওয়াজ) সিনেমাটিকে একটি আলাদা ন্যারেটিভ রিদম দিয়েছে।


চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রফেসর রশীদ উদ্দিন একজন গভীর জীবনবোধসম্পন্ন দার্শনিক ব্যক্তি হিসেবে গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক চরিত্র ক্ষমতা, অহংকার এবং মানবিকতার দ্বন্দ্ব তুলে ধরে। তাঁর স্ত্রী চরিত্রটি নীরবতা ও একাকিত্বের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি চিত্রা ও ডাক্তার আশহাব চৌধুরী নিজেদের জীবনের দোলাচল, স্বপ্ন ও সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। পাশাপাশি মৃত তরুণের আত্মার বর্ণনা সিনেমাটিকে এক ধরনের জাদুবাস্তব মাত্রা প্রদান করে।


মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, সাবিলা নূর, শরীফুল রাজ, আজমেরী হক বাঁধনসহ অন্যান্য অভিনেতাদের অভিনয় অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সংযত, যা সংলাপের চেয়ে নীরব অভিব্যক্তিকে বেশি শক্তিশালী করে তোলে।


এই সিনেমায় ট্রেনকে জীবনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—এর কামরাগুলো সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে, আর চাকার শব্দ মানবমনের চলমানতা ও সময়ের প্রবাহকে প্রকাশ করে। কুয়াশা, রাত ও আলো-ছায়ার খেলা একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হিসেবে কাজ করে।


সিনেমার সংগীত ব্যবহারে রয়েছে গভীর আবেগ। অর্থহীন ব্যান্ডের গান, আইয়ুব বাচ্চুর “উড়াল দেব আকাশে”, রবীন্দ্রসংগীত এবং ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর গল্পের আবেগকে আরও গভীর করেছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যগুলোতে।


যদিও সিনেমার প্রথম ভাগ কিছুটা ধীরগতির এবং কিছু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা (VFX ও লাইটিং) দেখা যায়, তবুও এর শিল্পগুণ ও গল্প বলার ধরন এসব সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে যায়।


সার্বিকভাবে বনলতা এক্সপ্রেস শুধু একটি ট্রেনযাত্রার গল্প নয়, বরং এটি জীবন, মৃত্যু, সম্পর্ক এবং আত্মিক পরিবর্তনের এক গভীর দার্শনিক উপস্থাপন, যা দর্শকদের আবেগ ও চিন্তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

advertisement image

Leave Your Comments